এই গরমে সুস্থ থাকুন
- By Health Info
- হেলথ টিপস
- Unrated
গ্রীষ্মের দাহ সবাইকে স্পর্শ করে, কিন্তু কেউ কেউ তাপাহত হন তীব্রভাবে। যেমন-মেদস্থূল লোক, ত্বকের নিচে যে বাড়তি মেদভাণ্ডার, তা ওভারকোটের মতো দেহকে পেঁচিয়ে থাকে যেন। এদের গরম লাগে বেশি। ছোট শিশু সহজেই বিশুষ্ক হয়ে যায়। কারণ, এদের দেহে পানির আসা-যাওয়ার হার খুব বেশি। বয়স্কদের দেহের তাপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে, তাই তাঁরা তাপাহত হন সহজে। খুব গরমের সময় হার্ট অ্যাটাকও হয় বেশি।
শরীর যখন ঘামছে বেশি
এ সময় ঘাম হয় বেশি, শরীরের জল ও খনিজ পদার্থ (লবণ) বেরিয়ে গিয়ে দেহে জল ও লবণের সমতা নষ্ট করে। আর্দ্র আবহাওয়ায় এর আশঙ্কা বেশি। লবণের ঘাটতি হলে পেশির সংকোচন ও আক্ষেপ ঘটে। পানির সমতা নষ্ট হলে বমি ভাব, দুর্বলতা, মাথাঘোরা, ক্ষুধামান্দ ঘটে। তাই গরমে খুব বেশি ঘাম হলে বারবার অল্প লবণ মেশানো জল, লেবুসহ শরবত বানিয়ে পান করা দরকার। এ ছাড়া হালকা চলাচলে সুতির জামা পরা উচিত। এতে ঘাম বায়ু চলাচলের মাধ্যমে বাষ্পীভূত হওয়ার সুযোগ পায়। সিনথেটিক কাপড়ের জামা, টেরিলিনের জামা পরলে তাপ ক্ষয় বাধা পায়। হালকা রঙের জামা পরা ভালো, এতে মনে শীতল ভাব আসে। ঘামের সঙ্গে এক ধরনের তৈলাক্ত পদার্থ নিঃসৃত হয়, এরা রোমকূপ বন্ধ করে এবং ঘাম বাষ্পীভবনে বাধা দেয়। তাই সাবান মেখে কুসুম গরমপানি দিয়ে স্মান করা সুখকর। খুব ঠান্ডা পানির চেয়ে ঈষদুষ্ণ পানি আরামদায়ক। কারণ, খুব ঠান্ডা পানিতে স্মান করলে ধমনি সংকুচিত হয়। এতে রক্ত ত্বক থেকে দেহের ভেতর প্রবাহিত হয় এবং তাপের ভালো আদান-প্রদান হতে পারে না।
তাপাহত হওয়া থেকে বাঁচুন
তাপাহত হওয়া থেকে বাঁচতে হলে কিছু প্রতিবোধব্যবস্থা প্রয়োজন। যাঁরা গরমে চলতে-ফিরতে অভ্যস্ত নন, তাঁরা চড়া রোদে ঘোরা যতদূর সম্ভব পরিহার করুন। রোদের প্রত্যক্ষ মুখোমুখি যত কম হওয়া যায় ততই মঙ্গল। সানস্ক্রিন লোশন ব্যবহার, টুপি পরে বা ছাতা মাথায় দিয়ে রোদে যাওয়া উচিত। পরা যায় সানগ্লাস।
পথে রোদে অনেক সময় চলার পর মাঝেমধ্যে ছায়াশীতল জায়গায় বা গাছের নিচে বিশ্রাম নিলে বিপদ এড়ানো অনেকাংশে সম্ভব।
পান করুন বিশুদ্ধ পানি
অন্তত দুই-তিন লিটার পানি পান করা উচিত, এমনকি তৃষ্ণার্ত না হলেও। ঘাম নিঃসরণের মাধ্যমে যে পানি ক্ষয় হয়, তা পূরণ হবে।
সহজপাচ্য ও হালকা খাবার খান
এ সময় খাবার হবে সহজপাচ্য ও হালকা। ক্ষুধামান্দ্য হতে পারে। তবে এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। অতিরিক্ত লবণ খাওয়া কিন্তু খারাপ। এতে রক্ত সংবহতন্ত্রের ক্ষতি হয়।
চাপ কমান
এ সময় অত্যধিক চাপ নেওয়া ঠিক নয়, কায়িক শ্রম ভারী ও দীর্ঘ সময় করাও ঠিক নয়। যখন আবহাওয়া অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা, যেমন সকালে ও সন্ধ্যায়, তখনই ভারী কাজগুলো করা ভালো।
ধীরে ধীরে সমতালে কাজ করলে ভালো, তাড়াহুড়ো করা ঠিক নয়। যখন ক্লান্ত লাগবে, তখন বিরতি বা একটু ঘুমিয়ে নেওয়া ভালো। দেহ রাখতে হবে সবল ও সুস্থ।
শরীরচর্চা করলে স্বেদগ্রন্থিরা থাকে সক্রিয় এবং বাইরের তাপ সহ্য করতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে শরীর। দিনের বেলা জানালা বন্ধ রাখা যায়, এতে ঘর থাকবে ঠান্ডা। রাতে খুলে দেওয়া যায়।
সতর্ক হোন ওষুধ সেবনে
ওষুধ সেবন করার সময় সতর্ক থাকা ভালো। অনেক ওষুধের গুণ অত্যধিক গরমে নষ্ট হয়ে যায়, তাই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ব্যবস্থাপত্র দেওয়া থাকলে তিনি তা বদলাতে পারেন।
দরকার বাড়তি স্বাস্থ্য-সচেতনতা
তাপাহত হয়েছেন মনে হলে অন্যের সাহায্য নিন এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। হাত-পা ফুলে উঠেছে কি না, রক্তচাপ কমেছে কি না এবং মাথা ধরেছে কি না, এ সম্পর্কে সতর্ক থাকা উচিত। ত্বকের পৃষ্ঠের সন্নিকটে রক্তনালিগুলো দীর্ঘক্ষণ স্কীত হয়ে থাকার লক্ষণ এগুলো। যাদের উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস আছে, তাদের তাপাহত হওয়া এড়িয়ে চলতে হবে। খুব গরমের মুখোমুখি হলে তাপে শ্রান্ত হওয়া, পায়ে খিল ধরা বা তাপাহত হওয়া ঘটে। গরমে ঘাম হয়ে বের হওয়ার তুলনায় তাপ যদি দেহে বেশি থেকে যায়, তখন শরীর পর্যাপ্ত শীতল হতে পারে না, হয়ে পড়ে উত্তপ্ত।
মাথাধরা, বমি, শ্বাসকষ্ট-এসব এড়াতে হলে তাপাহত ব্যক্তিকে নিয়ে আসতে হবে শীতল স্থানে। কঠোর শ্রম, রোদে ভারী কাজ এড়াতে হবে বেশ কয়েক দিন। তাপে খিঁচুনি হওয়ার সঙ্গে তাপে শ্রান্ত, অবসন্ন হওয়াও বিচিত্র নয়। পা ও উদরের পেশিতে বেশি খিঁচুনি হয়। তাপাহত পেশিকে টানটান করা এবং হাতের তালু দিয়ে ম্যাসাজ করা ভালো এবং এরপর ঈষদুষ্ণ পানিতে ধোয়া উচিত। তাপাহত হওয়া জীবন সংশয়ী জরুরি অবস্থা। দেহ তাপ খুব উঁচুতে ওঠে, ত্বক শুষ্ক ও তপ্ত হয়ে ওঠে, শ্বাসকষ্ট ও ঘাম নিঃসরণ ব্যাহত হয়, নাড়ি হয় দ্রুত। এ জন্য অবিলম্বে শরীরকে শীতল করার জন্য প্রাথমিক পরিচর্যা চাই।
-- তাপাহত লোককে শীতল পানি দিয়ে স্পঞ্জ করানো বা শীতল পানির বড় টাবে শোয়ানো উচিত।
-- তাপাহত লোককে শীতল, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল আছে এমন স্থানে সরিয়ে নেওয়া উচিত। তবে তাকে খুব দ্রুত শীতল করাও ঠিক নয়।
-- অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার।
**************************
অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী
পরিচালক, ল্যাবরেটরি সার্ভিসেস, বারডেম
প্রথম আলো, ২৯ এপ্রিল ২০০৯।