ফ্লু ভাইরাস প্রধানত হাঁচি-কাশির মাধ্যমে বাতাসের সাহায্যে ছড়ায়। অর্থাৎ ফ্লু আক্রান্ত কোনও ব্যক্তি যদি উন্মুক্ত স্থানে হাঁচি-কাশি দেয় তাহলে এক মিটার বা এক হাতের মধ্যে থাকা সুস্থ ব্যক্তিটিও আক্রান্ত হতে পারে। কিন্তু ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ফ্লুতে আক্রান্ত ব্যক্তি যদি বাতাসে হাঁচি-কাশি না দেয় তাহলে তার থেকে ভাইরাস ছড়ানোর কোনও সম্ভাবনাই থাকে না। এ ভাইরাস সুস্থ মানুষের নাক দিয়ে ঢুকে শ্বাসনালীর উপরের অংশে অবস্থান করে এবং এক-পাঁচদিন কোনওরকম উপসর্গ ছাড়াই এখানে অবস্থান করে। পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে এটি শ্বসনতন্ত্রের নিচের অংশে গিয়ে মারাত্মক লক্ষণ যেমন নিউমোনিয়া প্রকাশ করে।
ভাইরাস কতদিন মানবদেহে থাকে
ইনফ্লুয়েঞ্জার ভাইরাস এমনকি সোয়াইন ফ্লুর ভাইরাসও মানুষের শরীরে প্রবেশের পর থেকে সাতদিন থাকে। এ সময় জ্বর, সঙ্গে মাথা ও শরীর ব্যথা, চোখ লাল হওয়া, চোখ ও নাক দিয়ে পানি পড়া, দুর্বলতা, বমি বা বমি বমি ভাব এবং ডায়রিয়া হতে পারে। অর্থাৎ এসবই হচ্ছে ফ্লুর লক্ষণ। সোয়াইন ফ্লুর লক্ষণও এরকমই। তবে সোয়াইন ফ্লু যার বৈজ্ঞানিক নাম ঐ১ঘ১ তাতে জ্বরের সঙ্গে শ্বাসকষ্ট এং নাক দিয়ে পানি একটু বেশি পরিমাণে পড়তে পারে। সাতদিন পরে ফ্লুর ভাইরাস মানবদেহে আর থাকে না। কারণ এ সময় মানুষের দেহে ভাইরাসের বিপক্ষে এন্টিবডি তৈরি হয় অর্থাৎ মানুষ ইমিউন হয়ে যায়। একবার আক্রান্ত হলে একই প্রজাতির ভাইরাস দ্বারা মানুষ আর দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হয় না।
ভাইরাস নিয়ে চিন্তার কারণ
ভাইরাস নিজে মানুষকে মারে না, প্রকৃতপক্ষে ঐ১ঘ১ ভাইরাসের মারণক্ষমতাও নেই, কিন্তু এটি মানুষের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে বিভিন্ন জটিলতার সৃষ্টি করে। এ জটিলতা সৃষ্টি করে বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাস এবং এভাবে শতকরা একজনের মৃত্যু হতে পারে।
এ জটিলতার নাম পোস্ট ইনফ্লুয়েঞ্জা ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন, যার ফলে মধ্যকর্ণে ইনফেকশন বা প্রদাহ বা অটাইটিস মিডিয়া এবং নিউমোনিয়া হয়ে থাকে। নিউমোনিয়া ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস দিয়ে হতে পারে। প্রধান ব্যাকটেরিয়াগুলো হচ্ছে স্টেফাইলোকক্কাস অরিয়াস, স্ট্রেপটোকক্কাস নিউমোনি ও হেমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা। বেশিরভাগ রোগীর মৃত্যু হয় ব্যাকটেরিয়াল নিউমোনিয়া দ্বারা।
মানুষ কেন এত ফ্লুতে আক্রান্ত হচ্ছে
সর্বপ্রথম প্যানডেমিক ফ্লু যা স্প্যানিশ ফ্লু নামে পরিচিত তা ১৯১৮, ১৯১৯-এ হয়েছিল। এ সময় প্রায় ৪ কোটি লোক মারা গিয়েছিল। ভাইরাসের জীবাণু সংক্রমণের ক্ষমতা বা ভিরুলেন্স ছিল এ সময়ের ভাইরাসের চেয়ে অনেক বেশি। তখনও ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকরী এন্টিবায়োটিক আবিষ্কৃত হয়নি। সর্বপ্রথম এন্টিবায়োটিক পেনিসিলিন আবিষ্কার করেন আলেকজান্ডার ফ্লেমিং ১৯২৯ সালে। যেহেতু ভাইরাসের জটিলতায় অর্থাৎ ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে মানুষ মারা যায়, তাই এন্টিবায়োটিকের অভাবে সে সময় এত মৃত্যু হয়েছিল। ধারণা করা হয়েছিল এত মানুষের মৃত্যুর কারণ ছিল ব্যাকটেরিয়াজনিত নিউমোনিয়া। বর্তমানে নিউমোনিয়ার কার্যকরী ওষুধ রয়েছে এবং এর ফলে মৃত্যুহারও যথেষ্ট কমে গেছে। তাই ভাইরাস নয় সেকেন্ডারি ইনফেকশন ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাশের আক্রমণের কারণেই সোয়াইন ফ্লু থেকে মৃত্যু ঝুঁকি বাড়ে।
২০০৯ সালে মেক্সিকোতে যে সোয়াইন ফ্লুর আউটব্রেক হয়ে তাতে এ পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় ১৭৭টি দেশের প্রায় দুই লাখের অধিক মানুষ আক্রান্ত হয়েছে তবে ক্যাজুয়ালিটি বা মৃত্যুহার কিন্তু ততটা উল্লেখযোগ্য নয়। এর প্রধান কারণ দুটি-
এক. এখন ভাইরাল কেমোথেরাপি অর্থাৎ ক্যাপসুল ওসিলটামিভির আবিষ্কৃত হয়েছে যা চিকিৎসা ও প্রতিরোধে কার্যকরী এবং
দুই. সেকেন্ডারি ইনফেকশন অর্থাৎ ভাইরাস পরবর্তী ইনফেকশনের জন্য একাধিক কার্যকরী এন্টিবায়োটিক রয়েছে। এতসব চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ার কারণে ক্যাজুয়ালিটি শতকরা এক ভাগেরও কম হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
তবে বর্তমান যুগে ফ্লু দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে, বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন পথে মানুষের অবাধ যাতায়াত। গ্লোবাল ভিলেজে তাই মানুষ সংক্রমিতও হচ্ছে বেশি। কোনও দেশের প্রবেশ পথে যদি স্কিনিং অর্থাৎ রোগ নির্ণয় এবং আইসোলেশন অর্থাৎ সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আলাদা করে রাখা যায়, তবে ফ্লু বেশি ছড়িয়ে পড়ার কোনও আশংকাই থাকবে না। আমাদের দেশে এ ঘটনার পর থেকে মুখে মাস্ক পরার ব্যবহারও বেড়ে গেছে। দেশের সব মানুষ যদি একসঙ্গে মাস্ক পরে তবে এক মাসের মধ্যে এদেশ থেকে সোয়াইন ফ্লু উধাও হয়ে যাবে বলেও মনে করা হয়।
কারা আক্রান্ত হচ্ছে
শিশু, বৃদ্ধ এবং যারা দীর্ঘদিন থেকে রোগাক্রান্ত তারাই আক্রান্ত হন বেশি। এ সময় ফ্লু লাইক ইলনেস কারও দেখা দিলে পরীক্ষা করা ছাড়াই ক্যাপসুল ওসিলটামিভির শুরু করার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। যদি রোগ নির্ণয় করতে দেরি হয় ও এ রোগীর আগে থেকেই শরীরে অন্য কোনও জটিলতা থাকে কিংবা ফ্লু আক্রান্ত রোগীকে এন্টিভাইরাল ও এন্টিব্যাকটেরিয়াল ওষুধ শুরু করতে দেরি হয় তবে রোগীর মৃত্যু ঝুঁকি বেড়ে যায়।
ভাইরাস কি শুধু শূকরেই থাকে
শুধু শূকর নয়, পাখি, ঘোড়া, মাছ থেকে ফ্লু ভাইরাস মানুষে সংক্রমিত হওয়ার আশংকা থাকে। তাই যারা এদের সংস্পর্শে থাকে, তাদের ইমিউনিটি কম হলে, তারা নিজেদের এবং অন্যদের সংক্রমিত করতে পারে। আমাদের দেশে পাখিদের থেকে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস ছড়াচ্ছে কিনা সে ব্যাপারে স্টাডি হচ্ছে।
মনে রাখবেন, ঐ১ঘ১ ভাইরাস বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পরিবেশকে দূষিত করছে না বরং আমরা যদি প্রাথমিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলি ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকি তবে সোয়াইন ফ্লু নামক আতংক থেকে মুক্ত থাকতে পারব।
*************************
অধ্যাপক ডাঃ মোঃ নজরুল ইসলাম
সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
দৈনিক যুগান্তর, ০৫ সেপ্টেম্বের ২০০৯।